উত্তরবঙ্গ: উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যা। গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে থাকা তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, রায়ডাক নদীর জল রাতের অন্ধকারে বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। এখনো পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মানুষের মৃতদেহ সংখ্যা ২৮, খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না কয়েকশো উত্তরবঙ্গবাসীর। জলের প্রবল স্রোতে টিনের সারি সারি চালাঘরের সাথে ভেসে যাচ্ছে কয়েকশো অসহায় বন্যপ্রাণী। প্রতি মুহূর্তে লাফিয়ে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা। নতুন করে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে আলাদা আলাদা জনপদ। স্মরণাতীত ইতিহাসে এমন ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছে বলে মনে করতে পারছে না উত্তরবঙ্গবাসী।
পাহাড়ী দার্জিলিং থেকে গোটা উত্তরবঙ্গ সর্বত্র ব্যাপক ভূমিধসের কবলে। চোখের সামনে অসহায়ের মতো খাবি খাচ্ছে ডুবতে থাকা উত্তরবঙ্গের গর্ব একশৃঙ্গ বিশিষ্ট গন্ডার। কূল পাচ্ছে না বল্গা হরিণ। প্রবল শক্তিশালী হাতির দল সামান্য আশ্রয়ের খোঁজে ভেসে বেড়াচ্ছে। রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। খরস্রোতা নদীর উপরে সংযোগকারী সেতুগুলি ভেসে গেছে জলের তোড়ে। উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি পর্যটনকুল দিশেহারা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আটকে পড়েছে কয়েকশো পর্যটক। ভুটানের ওয়াং নদীর উপরে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বাঁধের গেট খোলা যাচ্ছে না। বাঁধ উপচে জলের স্রোত আছড়ে পড়ছে। ভুটান ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা দিয়ে সেই কথা জানিয়েছে। বাঁধ যদি কোনো কারণে ভেঙে যায়, ডুয়ার্সের অনেক জনপদ ভেসে যাবে। কত মানুষ মরবে, ক্ষয়ক্ষতি কেমন হবে তার হিসাব নেই।
তবে এ ঘটনা প্রথম নয়, যতবার প্রকৃতিকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে— প্রকৃতি তার দ্বিগুণ ক্ষমতায় নিজেকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়েছে। আমরা উত্তর ভারতে প্রকৃতির রক্তচক্ষু চাক্ষুষ করেছি। প্রবল ভূমিধসে চোখের সামনে ধূলিস্যাৎ হতে দেখেছি উত্তরাখণ্ড, হিমাচলকে। এবার আমাদের সিকিম, দার্জিলিংয়ের পালা। অনৈতিক ক্ষমতার জেরে ব্যাঙের ছাতার থেকেও সহজে গজিয়ে উঠেছে হোমস্টে। জঙ্গল সাফ করে তৈরি হয়েছে রিসর্ট। নদীর পরিবর্তিত খাত অবৈধ নির্মাণে বন্ধ হয়েছে। অদৃশ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে শাসন করার চেষ্টা হয়েছে প্রকৃতিকে। ফল যা হবার তাই— সবকিছু দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে নিজের বোঝা লাঘব করে কয়েক ঘণ্টায় নিজেকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়েছে। স্বাধীন কামতাপুর দাবি করলে আমাদের অস্মিতায় আঘাত লাগে, দার্জিলিং স্বশাসন চাইলে আমরা বাংলা ভাগের চক্রান্ত দেখি। কবির কল্পনায়, সাহিত্যের লালিত্যে উত্তরবঙ্গকে বঙ্গমাতার মুকুটের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সাহিত্য কবিতায় উত্তরবঙ্গ নিয়ে আদিখ্যেতা ছাড়া শুধুমাত্র ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে উত্তরবঙ্গ।
এতকিছুর পরেও আমাদের কিছু করার নেই, রাষ্ট্রীয় শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে দক্ষিণবঙ্গ, রাজস্ব জোগান দেয় উত্তরবঙ্গ, সেখানে মধ্যবঙ্গের তৃতীয় সন্তান হিসেবে দু’হাত আর দু’পায়ে লাফানো ছাড়া কী আর করতে পারি? বিবেক, বুদ্ধি ও মানবতাহীন এই বঙ্গে উত্তরবঙ্গের স্বজন হারানোর কান্না ফারাক্কা সেতুতেই আটকে যায়। দক্ষিণবঙ্গের আনন্দ উৎসবে ম্লান হয়ে যায় উত্তরবঙ্গের বুকফাটা আর্তনাদ!
