নদিয়া: আরজি করের সেই অভিশপ্ত লিফটের স্মৃতি এখনও টাটকা। তার মাঝেই এবার কৃষ্ণনগর জেলা প্রশাসনিক ভবনের ঠিক পাশেই এক সুলভ শৌচালয়ে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা তালাবন্দি হয়ে রইলেন এক কলেজ ছাত্র। ব্যস্ততম এলাকায় শৌচালয়ের বন্ধ গেটের ওপার থেকে প্রাণের ভয়ে ওই কিশোর চিৎকার করলেও, দীর্ঘক্ষণ হুঁশ ফেরেনি কারও। শেষ পর্যন্ত এক পথচারীর তৎপরতায় উদ্ধার করা হয় তাঁকে। এই ঘটনায় জেলা সদরের ব্যস্ততম এলাকার সংবেদনশীলতা ও নজরদারি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।
নির্বাচনী আবহে বর্তমানে কৃষ্ণনগর জেলা প্রশাসনিক ভবন চত্বরে সাজ সাজ রব। মনোনয়ন পর্ব চলায় এলাকা পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ারে ঠাসা। তার মধ্যেই ভাতজাংলা থেকে কৃষ্ণনগর আইটিআই কলেজে পড়তে আসা ছাত্র তমজিৎ চক্রবর্তী যে পরিস্থিতির শিকার হলেন, তাকে ‘অমানবিক’ বললেও কম বলা হয়। মঙ্গলবার সকালে কলেজ ও টিউশন সেরে ফেরার পথে ওই শৌচালয়ে ঢুকেছিলেন তমজিৎ। তাঁর দাবি, সেখানে তখন কোনও কর্মী ছিলেন না। মিনিট সাতেক পর বেরোতে গিয়ে তিনি দেখেন, বাইরের প্রধান কোলাপসিবল গেটে ঝুলছে বড় তালা।শুরু হয় এক রুদ্ধশ্বাস বন্দি দশা। মোবাইলে রিচার্জ না থাকায় কাউকে ফোন করতে পারেননি তমজিৎ। ভ্যাপসা গরমে শৌচালয়ের ঘুপচি ঘরে হাঁসফাঁস করতে করতে গেট ধরে চিৎকার শুরু করেন তিনি। বাইরে তখন পুলিশের বুটের আওয়াজ আর নিত্যযাত্রীদের কোলাহল। অথচ আশ্চর্যভাবে, আড়াই ঘণ্টা ধরে সেই আর্তনাদ কারও কান পর্যন্ত পৌঁছল না। তমজিতের কথায়, “আমি চিৎকার করে ডাকছিলাম, কিন্তু কেউ ফিরেও তাকায়নি। গরমে আর আতঙ্কে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ভেবেছিলাম হয়তো আর বেরোতেই পারব না।”
প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আমঘাটার বাসিন্দা সঞ্জিত ঘোষ নামে এক বাইক আরোহী ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় গোঙানি শুনতে পান। তিনি কাছে যেতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই ছাত্র। এর পর প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় শৌচালয়ের কর্মীর বাড়ি থেকে চাবি জোগাড় করে উদ্ধার করা হয় তমজিৎকে। উদ্ধারকারী সঞ্জিতবাবুর আক্ষেপ, “ছেলেটির যে অবস্থা দেখলাম, আর কিছুক্ষণ থাকলে ও অসুস্থ হয়ে পড়ত। প্রকাশ্য রাস্তায় পুলিশ-প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন অমানবিক কাণ্ড কী করে ঘটে, ভেবে অবাক হচ্ছি।শৌচালয় থেকে বেরিয়ে আসার দীর্ঘক্ষণ পরেও তমজিতের চোখেমুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনবহুল জায়গায় সরকারি শৌচালয় রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে যে চরম গাফিলতি রয়েছে, এই ঘটনাই তার বড় প্রমাণ। যেখানে কড়া নিরাপত্তার দাবি করা হচ্ছে, সেখানে আড়াই ঘণ্টা এক ছাত্রের চিৎকার কেন কারও কানে গেল না, তা নিয়ে সরব হয়েছেন শহরবাসী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে।
